০৬ জুন ২০২৬
বিগত চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সরাসরি মুখোমুখি বসার যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দিয়েছিলেন, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রেমলিন। আপাতত ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এমন কোনো শীর্ষ বৈঠকের প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা দেখছেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এর ফলে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধ থামানোর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন করে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র প্রতিবেদন সূত্র ধরে আজ শনিবার (৬ জুন) এই তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) একটি বিশেষ খোলা চিঠির মাধ্যমে পুতিনকে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন জেলেনস্কি। ওই চিঠিতে জেলেনস্কি অত্যন্ত বাস্তববাদী ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করে লিখেছিলেন—২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামাতে আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র) আবারও মধ্যস্থতা করতে মাথা ঘামাবে, এমন আশায় বসে থাকা হবে ইউক্রেনের জন্য একটি মস্ত বড় ‘ভুল’।
বিশ্লেষকদের মতে, জেলেনস্কি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক রাজনীতির পটপরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ মনোযোগ ও সামরিক রসদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে গেছে, যার ফলে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জেলেনস্কির পাঠানো ওই চিঠিকে ‘অমার্জিত’ বা শিষ্টাচারবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে তাঁর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের অনুরোধটি নাকচ করে দেন। পুতিন তাঁর আগের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্পষ্ট জানিয়েছেন—কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার আগে অবশ্যই বাস্তবসম্মত ‘শান্তি আলোচনা’ সম্পন্ন হতে হবে।
গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে (SPIEF) দেওয়া এক হাই-প্রোফাইল বক্তব্যে পুতিন সরাসরি বলেন:
“এই মুহূর্তে আমি জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের কোনো প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা দেখছি না। তাঁর এই চিঠি কি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল, নাকি এটি এমন একটি কূটনৈতিক চাল ছিল যাতে মুখোমুখি বৈঠকটি না হয়? আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টিই সঠিক।”
পুতিনের এমন নেতিবাচক ও কঠোর প্রতিক্রিয়া শোনার পর তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। কিয়েভ থেকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “রাশিয়া পুতিনের এই জবাবের মাধ্যমে আবারও শান্তিকে দূরে ঠেলে দিয়ে যুদ্ধকেই বেছে নিচ্ছে। তিনি (পুতিন) আসলে এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না। আমার মনে হয়, বিশ্বজুড়ে শান্তির পক্ষে থাকা কোটি কোটি মানুষ পুতিনের এই অহংকারী উত্তরে চরম হতাশ হয়েছে।”
ইউক্রেনের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে মস্কো বেশ কয়েকটি কঠোর শর্তের ওপর অনড় রয়েছে। রাশিয়ার মূল শর্তগুলো হলো:
- ইউক্রেনকে তাদের দাবি করা দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং ঝাপোরিজ্জিয়া—এই চার অঞ্চল থেকে নিজেদের সেনা পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হবে এবং এই অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে।
- ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে কখনোই পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো (NATO)-তে যোগ না দেওয়ার লিখিত গ্যারান্টি বা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
অন্যদিকে, কিয়েভ প্রশাসন রাশিয়ার এই শর্তগুলোকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছে এবং নিজেদের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও মস্কোর হাতে ছেড়ে দিতে সম্পূর্ণ নারাজ। ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের যুক্তি হলো—মস্কোকে যদি এখন কোনো ধরনের ভূখণ্ডগত ছাড় দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে এবং কয়েক বছর পর আরও শক্তিশালী হয়ে ইউক্রেনে আবারও বড় ধরনের আক্রমণ করতে উৎসাহিত হবে।
দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে চার বছরে পা রাখা এই যুদ্ধ নিকট ভবিষ্যতে থামার কোনো লক্ষণই দেখছেন না সামরিক বিশ্লেষকরা।





Total views : 7300