০৪ জুন ২০২৬
আধুনিক ও পরিবর্তনশীল যুদ্ধক্ষেত্রে চালকবিহীন ড্রোনের ক্রমবর্ধমান কার্যকারিতা ও আকাশচুম্বী চাহিদা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন কেনার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারত। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে দেশটির সামরিক ইতিহাসে একক কোনো কর্মসূচির অধীনে সবচেয়ে বড় দেশীয় ড্রোন ক্রয় বা সংগ্রহের রেকর্ড।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় শিল্প সংস্থা ‘ড্রোন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’ (ডিএফআই) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
২৪ মাসের মধ্যে সরবরাহ: মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে
৫৫০টিরও বেশি দেশীয় ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করা ডিএফআই-এর সভাপতি স্মিত শাহ জানান, ভারতের এই মেগা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাটি বর্তমানে চূড়ান্ত ও অত্যন্ত উন্নত পর্যায়ে রয়েছে। দেশের জরুরি ও কর্মক্ষম সামরিক চাহিদা মেটাতে এই বিশাল ক্রয়াদেশের ড্রোনগুলো ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ বা দ্রুততম প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যেই এসব ড্রোনের শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
স্মিত শাহ আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকার কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) শ্রেণির ড্রোনের জন্য দেশীয় কোম্পানিগুলোকে ৩০ বিলিয়ন রুপি বা ৩১ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলারের যে ক্রয়াদেশ দিয়েছিল, নতুন এই বরাদ্দ তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ভারতের পরবর্তী ধাপের এই কৌশলগত ড্রোন সংগ্রহের আর্থিক পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন রুপি (২ হাজার কোটি রুপি) বা ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তবে এই বিশাল মেগা প্রজেক্টের বিষয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন এই ড্রোন বিপ্লব? পাকিস্তান সংঘাত ও বৈশ্বিক প্রভাব
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের মে মাসে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে এক সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকেই মূলত ড্রোন প্রযুক্তির দিকে সর্বোচ্চ জোর দিতে শুরু করে নয়াদিল্লি। ওই সংঘর্ষে দুই দেশই প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ড্রোন ব্যবহার করেছিল, যা কম খরচে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালানোর এক বিধ্বংসী চিত্র সামনে নিয়ে আসে। এ ছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-কুয়েত ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাত বিশ্বব্যাপী ড্রোনের কার্যকারিতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, যা সামরিক খরচ কমিয়ে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চিরাচরিত কৌশল পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইজি ডিফেন্স’-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তথা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র পাধি এ বিষয়ে বলেন:
“আধুনিক রণক্ষেত্রে ড্রোন এখন যেকোনো বাহিনীর শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান উপাদান। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের জরুরি ও দ্রুতগতির বিশেষ ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুব বড় পরিসরে ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করার পথে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগোচ্ছে।”
এর আগে গত মার্চ মাসে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন পরিবহন বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ‘রিমোটলি পাইলটেড স্ট্রাইক এয়ারক্রাফট’ বা সশস্ত্র ড্রোন কেনার জন্য প্রায় ২ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি রুপির (২৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার) একটি বিশাল বাজেট অনুমোদন করেছিল।
সুফল পাচ্ছে আদানি, টাটাসহ দেশীয় স্টার্টআপগুলো
ভারতের এই বিশাল বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে শতভাগ দেশীয় প্রযুক্তিকে (মেক ইন ইন্ডিয়া) অগ্রাধিকার দেওয়া। বর্তমানে ভারতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০০-এরও বেশি প্রতিষ্ঠান ড্রোন ও ড্রোনের বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন করছে, যার মধ্যে শতাধিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি দেশটির প্রতিরক্ষা খাতের জন্য কাজ করছে।
ভারতের এই উদীয়মান ড্রোন বাজারে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে:
- আদানি গ্রুপ (Adani Group)
- লারসেন অ্যান্ড টুবরো (L&T)
- টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস (Tata Advanced Systems)
একই সঙ্গে জায়ান্টদের পাশাপাশি আইডিয়াফোর্জ, নিউস্পেস রিসার্চ এবং অ্যাস্টেরিয়া অ্যারোস্পেস-এর মতো নতুন ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোও বাজারে দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করে তুলছে। এই কোম্পানিগুলো মূলত শত্রুপক্ষের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ড্রোন, লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ড্রোন, আত্মঘাতী লয়টারিং মিউনিশন (কামিকাজে ড্রোন) এবং নিখুঁত নিশানা বা নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম ড্রোন তৈরিতে কাজ করছে।






Total views : 7312